প্রশ্ন- পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত ইতিহাস পাঠকালে ফয়সাল জানতে পারল যে, পাল শাসনের অবসানের যুগে বাংলার ব্যাপক অংশ নিয়ে এগার শতকের মাঝামাঝি পর্বে প্রতিষ্ঠিত হয় শক্তিশালী সেন বংশের শাসন। সেনরা সুদূর দাক্ষিণাত্যের কর্ণাট থেকে এদেশে আসেন। সেনদের প্রচেষ্টায় পুরো বাংলা একটি ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত হয়। যাহোক শেষ সেন রাজা লক্ষ্মণ সেনের শাসনামলে বাংলায় মুসলিম শক্তি আধিপত্য বিস্তার করে এবং বাংলার ইতিহাসে শুরু হয় মধ্যযুগ।
ক. বাংলায় সেন বংশের প্রতিষ্ঠাতা কে ছিলেন?
খ. সেনবংশ প্রতিষ্ঠার পটভূমি ব্যাখ্যা কর।
গ. ইতিহাস পাঠ হতে শিক্ষা নিয়ে ফয়সাল কীভাবে শক্তিশালী এ বংশের পতনকে ব্যাখ্যা করবে?
ঘ. তুমি কাকে শক্তিশালী এ বংশের শ্রেষ্ঠ শাসক মনে করা, যুক্তিপূর্ণ মতামত উপস্থাপন কর।
প্রশ্নের উত্তর-
ক) বাংলায় সেনবংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন সামন্ত সেন।
খ) পাল শাসনের অবসানের পর বাংলায় সেনবংশ প্রতিষ্ঠিত হয়। সেনদের আদিবাস ছিল দাক্ষিণাত্যের কর্ণাটে। চালুক্যরা যখন বাংলা আক্রমণ করতে আসে তখন তাদের সেনাবাহিনীর সঙ্গেই সেনদের আগমন ঘটে। বাংলায় আসার পর এরা পালদের সেনাবাহিনীতে বা উচ্চ রাজপদে অধিষ্ঠিত হয়। পরে পালদের দুর্বলতার সুযোগে এরা বাংলার রাজদণ্ড ছিনিয়ে নেয়। বাংলায় সেনবংশের ভিত্তি স্থাপন করেন সামন্ত সেন। কিন্তু তিনি রাজ্য প্রতিষ্ঠা না করায় সেনবংশের প্রথম রাজার মর্যাদা দেওয়া হয় তাঁর পুত্র বিজয় সেনকে।
গ) সেনবংশের শেষ রাজা লক্ষ্মণ সেন নদীয়াতে বসবাস করতেন। লক্ষ্মণ সেনের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে বাংলায় সেনবংশের পতন হয় এবং লক্ষ্মণ সেনকে পরাজিত করেন তুর্কি বীর বখতিয়ার খলজী। আর তাঁরই হাত ধরে বাংলায় মুসলিম শাসনের সূত্রপাত হয়।তুর্কি বীর বখতিয়ার খলজী ১২০৩ খ্রিষ্টাব্দে বাংলার কাছাকাছি বিহার জয় করেছিলেন। তাই নদীয়ার অধিবাসীদের মধ্যে ভীতি কাজ করছিল যে, কখন নদীয়ায় তুর্কি যোদ্ধারা আঘাত হানবে। কুশলী যোদ্ধা বখতিয়ার খলজী বুঝতে পেরেছিলেন যে, সেনরাজারা তাদের বাধা দেওয়ার জন্য সৈন্য প্রস্তুত রাখবেন। বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে এ পথে চলা সম্ভব নয় বলে তিনি তাঁর সৈন্যবাহিনীকে কয়েকটি দলে বিভক্ত করেন। প্রথম দলের ১৭ বা ১৮ জন সৈন্যের সাথে তিনি নদীয়াতে প্রবেশ করেন। তাই নদীয়ার মানুষ তাঁর উদ্দেশ্য বুঝতে পারল না। তারা মনে করল, ঘোড়া ব্যবসায়ীর দল এসেছে এবং তারা ঘোড়া বিক্রি করার জন্য লক্ষ্মণ সেনের প্রাসাদে যাচ্ছে। সুতরাং প্রাসাদের দরজা খুলে দেওয়া হল। তখন ভর দুপুর। ক্লান্ত প্রাসাদ রক্ষীদের ওপর অতর্কিতে ঝাঁপিয়ে পড়লেন বখতিয়ার খলজী। চারদিকে শোরগোল উঠল যে, লক্ষ্মণ সেনের প্রাসাদ বখতিয়ার খলজীর দখলে এসে গেছে। ইতোমধ্যে বখতিয়ারের বাকি সৈন্যরাও প্রবেশ করে নদীয়ায়। এভাবে বখতিয়ার খলজী নদীয়া দখল করার পর সেনদের রাজধানী লক্ষ্মণাবতীও দখল করেন। তাই বলা যায় যে, কৌশল এবং সাহসের মাধ্যমে তুর্কি বীর বখতিয়ার খলজী সেনদের পতন ঘটিয়েছিলেন।
ঘ) আমি মনে করি, বাংলায় সেনবংশের শ্রেষ্ঠ শাসক ছিলেন বিজয় সেন। কেননা তিনি সেন শাসনকে সম্পূর্ণ কণ্টকমুক্ত করে শক্ত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠা করেন।হেমন্ত সেনের পুত্র বিজয় সেন (১০৯৮ – ১১৬০ সাল) তাঁর রাজত্বের প্রথম পঁচিশ বছর একজন সামন্ত অধিপতি ছিলেন। কৈবর্ত বিদ্রোহের সময় তিনি রামপালের সাহায্যে এগিয়ে এসেছিলেন। এগার শতকে দক্ষিণ রাঢ় শূর বংশের অধিকারে ছিল। এ বংশের রাজকন্যা বিলাসদেবীকে তিনি বিয়ে করেন। এ আত্মীয়তার সূত্রে রাঢ় বিজয় সেনের অধিকারে চলে আসে। এরপর বিজয় সেন বর্মরাজাকে পরাজিত করে পূর্ব ও দক্ষিণ বাংলা সেন অধিকারে নিয়ে আসেন। শেষ পাল রাজাদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে বিজয় সেন উত্তর-পশ্চিম বাংলা আক্রমণ করে পালরাজা মদনপালকে পরাজিত করেন। এ অঞ্চল বার শতকের মাঝামাঝিতে সেন শাসনভুক্ত হয়। এরপর তিনি কামরূপ, কলিঙ্গ ও মিথিলা আক্রমণ করেন। এভাবে বাংলায় সেনদের বিশাল রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। হুগলি জেলার ত্রিবেণীতে অবস্থিত বিজয়পুর ছিল বিজয় সেনের প্রথম রাজধানী। দ্বিতীয় রাজধানী স্থাপন করা হয় ঢাকার বিক্রমপুরে। বিজয় সেন 'পরমমহেশ্বর', 'পরমভট্টারক', 'মহারাজাধিরাজ', 'অরিরাজ বৃষভশঙ্কর' প্রভৃতি উপাধি গ্রহণ করেন।বাংলার ইতিহাসে বিজয় সেনের রাজত্বকাল এক গৌরবময় অধ্যায়। তিনি প্রায় সুদীর্ঘ ৬২ বছর রাজত্ব করেন। তিনি ছিলেন বুদ্ধিমান, সাহসী ও রণকুশলী। সামান্য একজন সামন্ত থেকে তিনি নিজ শক্তিবলে সমগ্র বাংলায় এক সুদৃঢ় ও সার্বভৌম রাজশক্তি স্থাপন করতে সমর্থ হয়েছিলেন। তিনি বাংলায় দৃঢ় রাজশক্তি প্রতিষ্ঠা করে সুখ ও শান্তি আনয়ন করতে সক্ষম হন। তাঁর শাসনের পূর্বে কখনও সমগ্র বাংলা একাধিপত্যে থাকে নি। এক্ষেত্রে তিনি বিশেষ কৃতিত্বের দাবিদার। তিনি সেন শাসনকে এমন একটি ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন যা সেনবংশের অন্যকোনো শাসকের দ্বারা সম্ভব হয় নি। এসব কারণেই তাঁকে সেনবংশের শ্রেষ্ঠ শাসক বলা যুক্তিযুক্ত।